স্থানীয় ছাত্রদের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়টি ১৮৭১ সালে প্রায় ৩.৭৩ একর জমির ওপর শিক্ষানুরাগী রায় বাহাদুর অন্নদা প্রাসাদ রায় তাঁর নামানুসারে প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৮৬ সালে এটি জাতীয়করণ হয়। তবে জাতীয়করণের পর থেকেই স্কুলটিতে শিক্ষকসংকট যেন পিছু ছাড়ছে না।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দেবব্রত দাস জানান, প্রধান শিক্ষকসহ বিদ্যালয়ে মোট ১৮ জন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কাগজে-কলমে রয়েছেন মাত্র আটজন। এর মধ্যে দেশে ও বিদেশে প্রশিক্ষণে দুজন থাকায় বাস্তবে পাঠদান কার্যক্রমের পুরো চাপ পড়েছে মাত্র ছয়জন শিক্ষকের ওপর। প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর বারবার আবেদন জানিয়েও সংকট দূর না হওয়ায় রীতিমতো নিরাশ হয়ে গেছি। আমাদের এখানে ছাত্রসংখ্যা ৫২৯ জন। তবে শত প্রতিকূলতার মাঝেও আমরা শিক্ষার মান ও পরীক্ষার কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ধরে রাখার চেষ্টা করছি।
শিক্ষকসংকট কাটাতে স্কুল কর্তৃপক্ষ দুজন অতিথি শিক্ষক (গেস্ট টিচার) নিয়োগ দিলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে ১০টি শ্রেণির শাখায় পাঠদান কার্যক্রম বেসামাল হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে শাখা সংকুচিত করে মূল শাখায় শিক্ষার্থীদের এনে পাঠদান চালাতে হচ্ছে। বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে বাংলা, ইংরেজি, সামাজিক বিজ্ঞান, ইসলাম ও হিন্দুধর্ম এবং বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক নেই বললেই চলে। বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক শাখার বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের অভাবে নবম ও দশম শ্রেণির অভিভাবকদের মাঝে তীব্র উদ্বেগ ও হতাশা বিরাজ করছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় সরাইল অন্নদা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এ প্লাস (A+) প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ১০ জন; অন্যদিকে সরাইল পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে এ প্লাস পেয়েছেন ১৫ জন শিক্ষার্থী।
অভিভাবকদের অভিযোগ, বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র শিক্ষকসংকট চললেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। অনেক বিষয়ে নিয়মিত ক্লাস না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিভাবকরা বলেন, বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক শাখার মূল বিষয়সহ বাংলা, ইংরেজি ও ধর্মের মতো আবশ্যিক বিষয়ের শিক্ষকও নেই। আমরা না পারছি সন্তানদের পড়াশোনায় মনোযোগ বসাতে, না পারছি অন্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাতে। এ অবস্থা চলতে থাকলে বিদ্যালয়টি তার অতীত ঐতিহ্য হারিয়ে শূন্যের কোঠায় পৌঁছবে।
এদিকে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা সার্ধশতবর্ষ পূর্তি উৎসবের নানা আয়োজন ও উপকমিটি গঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও দীর্ঘদিনের এই শিক্ষকসংকট নিরসনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও বোদ্ধাজনেরা।ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, বিদ্যালয়টির শিক্ষক শূন্যতার বিষয়টি তাঁরা অবগত আছেন এবং শিক্ষক পদায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
নবযোগদানকৃত সরাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মীর কামরুজ্জামান কবির বলেন, সরকারি এই স্কুলের শিক্ষকসংকটের বিষয়টি জেনেছি এবং খোঁজখবর নিয়েছি। সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি দ্রুত জানানোর ব্যবস্থা নিচ্ছি। আশা করি, নতুন শিক্ষক নিয়োগের মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান হবে।দেড়শ বছরের পুরোনো এই বিদ্যাপীঠের ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, দ্রুত শূন্য পদে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক, এলাকাবাসী, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং উপজেলা নাগরিক কমিটি।









